লোভী শিয়াল ও বুদ্ধিমান টুনটুনির যুদ্ধ: অরণ্যপুরের কিচ্ছা (পর্ব ১) - ছোটদের সেরা শিক্ষামূলক গল্প
লোভী শিয়াল ও
বুদ্ধিমান টুনটুনির যুদ্ধ: অরণ্যপুরের কিচ্ছা (সেশন ১, পর্ব ১)
স্বাগতম আমাদের ব্লগের বিশেষ সিরিজ "অরণ্যপুরের
কিচ্ছা"-তে। ছোটবেলায় আমরা সবাই দাদি-নানির মুখে রূপকথার গল্প শুনে বড় হয়েছি। সেই
নস্টালজিয়া আর নৈতিক শিক্ষাকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে আমরা শুরু করেছি
এই বিশেষ কার্টুন ও গল্প সিরিজ। আজকের প্রথম পর্বে আমরা জানবো এক লোভী শিয়াল এবং
এক চতুর টুনটুনি পাখির বুদ্ধির লড়াইয়ের কথা।
অরণ্যপুরের
প্রেক্ষাপট
গভীর এক অরণ্য, যার নাম অরণ্যপুর। এখানে আকাশছোঁয়া মহীরুহ যেমন আছে, তেমনি আছে কলকল
ধ্বনিতে বয়ে চলা স্বচ্ছ পানির নদী। এই বনের প্রতিটি কোণে লুকিয়ে আছে রোমাঞ্চ আর
রহস্য। অরণ্যপুরের সব প্রাণীরা মিলেমিশে থাকলেও, সব সময় শান্তি বজায় থাকে না। কারণ, এই বনেই বাস করে
লালু নামের এক ধূর্ত শিয়াল।
মূল গল্প: যখন
ক্ষুধা আর বুদ্ধি মুখোমুখি
এক রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে অরণ্যপুরের এক বিশাল কৃষ্ণচূড়া
গাছের ডালে বসে মনের সুখে গান গাইছিল ছোট্ট টুনটুনি। টুনটুনি আকারে ছোট হলেও তার
সাহস আর বুদ্ধি ছিল প্রখর। তার মিষ্টি গানের আওয়াজ বনের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল।
ঠিক সেই সময় গাছের নিচ দিয়ে যাচ্ছিল লালু শিয়াল। লালু
গত দুদিন ধরে কিছুই খেতে পায়নি, তাই তার মেজাজ ছিল খিটখিটে আর পেট ছিল ক্ষুধার্ত। টুনটুনির গান শুনে সে ওপরের
দিকে তাকালো এবং মনে মনে ভাবলো, "আহা! আজ যদি এই টুনটুনিটাকে জলখাবার হিসেবে পাওয়া যেত, তবে মন্দ হতো না!"
কিন্তু টুনটুনি বসে আছে অনেক উঁচুতে। শিয়াল তো আর গাছে
উঠতে পারে না! তাই লালু তার চিরাচরিত ধূর্ত বুদ্ধি খাটিয়ে টুনটুনিকে নিচে নামিয়ে আনার ফন্দি
আঁটলো।
লালু গলা নামিয়ে খুব বিনয়ের সাথে বলল, "ওহে টুনটুনি দিদি!
তোমার গান তো স্বর্গের অপ্সরাদের চেয়েও সুন্দর। আমি এই বনের অধম এক শ্রোতা, তোমার গানের ভক্ত
হয়ে গেছি। কিন্তু আফসোস, আমার কানে একটু সমস্যা আছে। তুমি যদি কষ্ট করে নিচের
ডালে এসে গাইতে, তবে প্রাণভরে তোমার গান শুনতে পারতাম।"
টুনটুনি বোকা ছিল না। সে লালুর চোখের লালসা দেখে বুঝে
ফেলল যে শিয়াল তাকে শিকার করতে চাইছে। সে মনে মনে হাসলো এবং ভাবলো, "দাঁড়াও লালু ভাই, তোমাকে আজ এমন গান
শোনাবো যে সারা জীবন মনে রাখবে!"
টুনটুনি উত্তর দিল, "লালু ভাই, তোমার সমঝদারির
জন্য ধন্যবাদ। আমি নিচে আসতাম, কিন্তু সমস্যা হলো আমার এক পরম বন্ধু এই কাছেই এক বড়
পাথরের নিচে লুকিয়ে আছে। সে খুব লাজুক, তাকে ছাড়া আমি নিচে নামতে পারি না। তুমি যদি দয়া করে
ওই বড় পাথরটা একটু সরিয়ে দাও, তবে আমরা দুজনেই তোমার কাছে আসবো।"
লালু শিয়াল ভাবল, "পাথরের নিচে বন্ধু? নিশ্চয়ই কোনো বড়সড় পাখি বা খরগোশ হবে! আজ তো তাহলে ভোজ
হবে রাজকীয়!" লোভে পড়ে লালু আর
এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে তার সর্বশক্তি দিয়ে সেই বিশালাকার পাথরটি ঠেলতে শুরু
করল।
কিন্তু লালু জানত না যে, সেই পাথরের ঠিক নিচেই ছিল বুনো মৌমাছিদের এক বিশাল
চাক। যেই না পাথরটি নড়ে উঠল, অমনি কয়েক হাজার রাগী মৌমাছি ভোঁ ভোঁ শব্দে বেরিয়ে এলো। লালু কিছু বুঝে ওঠার
আগেই মৌমাছিরা তাকে ছেঁকে ধরল।
"ওরে বাপ রে! ওরে মা রে! মরে গেলাম রে!" বলে লালু শিয়াল
বনের ভেতর দিগিবিদিক দৌড়াতে লাগল। টুনটুনি ওপর থেকে ডানা ঝাপটিয়ে হাসতে হাসতে বলল, "কেমন বুঝলে লালু
ভাই? পরকে ঠকাতে গেলে
নিজেরই বিপদ হয়!"
চরিত্র বিশ্লেষণ:
লালু শিয়াল বনাম টুনটুনি
এই গল্পে আমরা দুটি ভিন্ন মানসিকতার চরিত্র দেখতে পাই: ১. লালু শিয়াল: সে ক্ষমতার
অপব্যবহার এবং মিথ্যা চাটুকারিতার প্রতীক। সে মনে করে ছলনা দিয়ে যেকোনো কিছু জয়
করা সম্ভব। ২. টুনটুনি: সে ধৈর্য এবং উপস্থিত বুদ্ধির প্রতীক। সে বিপদে ঘাবড়ে
না গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে শত্রুকে তার নিজের ফন্দিতেই কুপোকাত করেছে।
এই গল্প থেকে
আমাদের শিক্ষা (Moral of the Story)
"অতি লোভে তাঁতি নষ্ট" অথবা "ধূর্ততা দিয়ে
সাময়িক জয় পাওয়া গেলেও, বুদ্ধির কাছে তা পরাজিত হয়।" বাস্তব জীবনেও
আমাদের চারপাশে এমন অনেক 'লালু শিয়াল' থাকে যারা মিষ্টি কথায় আমাদের ক্ষতি করতে চায়। এই গল্পটি শিশুদের শেখায় যে, কারো মিষ্টি কথায়
প্রলুব্ধ না হয়ে নিজের বুদ্ধি এবং বিচক্ষণতা ব্যবহার করা উচিত।
উপসংহার
"অরণ্যপুরের কিচ্ছা" সিরিজের প্রতিটি পর্বে আমরা
এমন সব রোমাঞ্চকর গল্প নিয়ে আসবো যা আপনার শিশুকে বিনোদনের পাশাপাশি সঠিক জীবনবোধ
শেখাবে। আমাদের আজকের এই গল্পটি আপনার কেমন লেগেছে তা নিচের কমেন্ট বক্সে অবশ্যই
জানাবেন।
আমাদের পরবর্তী পর্বে আসছে— "বনরাজ সিংহের বিচার ও এক চতুর
খরগোশ"। সেই পর্যন্ত ভালো থাকুন এবং সুস্থ থাকুন।


Comments
Post a Comment